অনুপমের চেম্বারের বাইরে সামনের মেঝেতে মিমি পড়ে আছে

ডাঃ অনুপমের চেম্বারের বাইরে, সামনের মেঝেতে মিমি পড়ে আছে। তার সারা শরীর সমান তালে কাঁপছে। চোখ উলটে গেছে। গলাকাটা মুরগির মত মেয়েটা মেঝেতে ছটফট করছে। মুখ দিয়ে হালকা ফেনাও বের হচ্ছে। কেমন গোঁ গোঁ আওয়াজ করছে। মিমির পাশেই আরেকটি মধ্যবয়সী মহিলা চিৎকার করছেন। মহিলার চিৎকারে আশেপাশের লোকজন এসে ভীড় জমালো।

ইতোমধ্যে ডাঃ অনুপমও বাইরে চলে এসেছে। ভীড়ের মধ্যে এক বৃদ্ধা মহিলা সবাইকে আয়াতুল কুরসী পড়তে বলছে! এক ভদ্রলোক আবার তার চামড়ার জুতো মিমির নাকের কাছে ধরে আছেন! . ডাঃ অনুপম প্রচন্ড বিরক্ত হলেন। হাসপাতালে থাকা অবস্থায় একটা মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। কোথায় লোকজন ডাক্তারকে ডাকবে, তা না করে চিৎকার চেঁচামেচি করে পুরো হাসপাতাল মাথায় তুলে ফেলেছে! ডাঃ অনুপম মিমির কাছে গিয়ে বসলেন। ভদ্রলোককে বললেন জুতা সরাতে।

শারীরিক ঝাঁকুনি থামানোর চেষ্টা করলেন। বৃদ্ধা মহিলা ডাঃ অনুপমকে উদ্দেশ্য করে বললো, ” বাবা, ধইরোনা তুমি। এগুলা জ্বীনের কারবার। আয়াতুল কুরসী পড়ো বাবা, আয়াতুল কুরসী।” ডাঃ অনুপম আস্তে আস্তে রেগে যাচ্ছেন। নার্সরা চেষ্টা করেও লোকজন সরাতে পারছেন না। সবাই যেন দাঁড়িয়ে মজা দেখছে! মধ্যবয়স্ক লোকটা আবারো জুতো নিয়ে নাকের কাছে ধরার চেষ্টা করছে। ডাঃ অনুপম এবার প্রচন্ড জোরে ধমক লাগালেন। মুহূর্তে চারপাশ নীরব হয়ে গেলো।

শুধুমাত্র বৃদ্ধা মহিলাকে বিড়বিড় করতে দেখা গেলো। . মিমিকে স্ট্রেচারে তুলে একটা বেডে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে তাকে প্রাথমিক একটা ট্রিটমেন্ট দেয়া হলো। ডাঃ যুথী ডাঃ অনুপমকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “মেয়েটার তো মৃগীরোগ আছে অনুপম। ” –” হুম, তাই তো দেখছি। এক কাজ করো যুথি, মেয়েটার বাসায় ফোন দাও। মিমি আপাতত কথা বলার মত অবস্থায় আছে। নার্সকে বলো ওর থেকে বাসার নাম্বারটা কালেক্ট করতে। ” ডাঃ যুথি সামান্য ভেবে বললেন, ” আচ্ছা আমিই যাচ্ছি। নার্সকে মিমি বাসার ফোন নাম্বার দেবে বলে মনে হয়না। আমি যাচ্ছি ওর কাছে ঠিক আছে, যাও মিমি অস্থিরভাবে বেডে এপাশ ওপাশ করছে।

অনেকটা দেরী হয়ে গেছে। এবার তার বাসায় ফেরা দরকার। ডাঃ যুথি মিমির কাছে আসলেন। মিমির দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে বললেন, ” এই মেয়ে, তুমি তো বেশ ভয় পাইয়ে দিলে সবাইকে। তোমার মৃগী আছে মাই গড! আমি তো এই রোগটাকে খুবই ভয় পাই। ” প্রতিউত্তরে মিমি কিছু বললোনা। সামান্য হাসলো। ডাঃ যুথি আবারো বললেন, ” আচ্ছা মিমি, তোমার বাসার কারো ফোন নাম্বার দাও। তাদেরকে এখানে আসতে বলি। এসে তোমাকে নিয়ে যাক। ” মিমি আঁৎকে উঠলো।

ম্যাম প্লিজ, আমার বাসায় এগুলো জানানোর দরকার নেই। আমি একাই চলে যেতে পারবো। প্লিজ ম্যাম। ” –” আরে মেয়ে শুনো, তুমি যেটা বলতে মানা করেছ, সেটা বলবোনা, নো ওরি। দাও নাম্বার টা দাও। ” মিমি শোয়া থেকে উঠে বসলো। বেড থেকে নেমেও দাঁড়াল। “দেখুন ম্যাম আমি সম্পূর্ণ ঠিক আছি এখন। বাসায় বলতে হবেনা। আমি নিজেই চলে যাব।

আপনি বরং আমাকে বলুন আলট্রাসনোগ্রাফে কি আসলো। মানে আসলেই কি কিছু আছে আমার গর্ভে?” . ডাঃ যুথি কি বলবেন বুঝতে পারলেন না। ” তোমাকে ডাঃ অনুপম আরেকটা টেস্ট দিয়েছেন। তুমি বরং ওটা আগে করো। তারপর জানাবো তোমাকে। এখনই করিয়ে ফেলো, নাকি? আমি বলে দিচ্ছি ইমারজেন্সী করিয়ে দিতে।” একটু ভেবে মিমি বললো, “না ম্যাম, আজ দেরী হলো খুব। আমি কাল আবার আসবো।

আজ যাই।”– বলেই অনুমতির অপেক্ষা না করেই মিমি বেরিয়ে গেলো। ডাঃ যুথি একবার ভাবলেন আটকাবেন। তারপর কি ভেবে আবার আটকালেন না। …. হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার সময় ডাঃ অনুপম ডাঃ যুথিকে বললেন, ” আমার তোমার সাথে মিমির বিষয়টা নিয়ে কয়েকটা কথা বলার ছিলো।

তোমার ড্রাইভারকে আসতে বলার দরকার নেই। আমার গাড়িতে চলো। যেতে যেতে আলোচনা করা যাবে।” –” ঠিক আছে, সমস্যা নেই। ” . গাড়িতে উঠেই যুথি জিজ্ঞেস করলো, “কি যেন বলবে বলছিলে? বলো” –” আচ্ছা যুথি, তোমাদের ধর্মে নাকি এক ধরনের জ্বীন আছে, যারা সুন্দর মেয়েদের সাথে ঘুমের ভেতর শারীরিক সম্পর্ক করার চেষ্টা করে। এটা কি সত্যি?” ডাঃ যুথি নিশ্বাস ফেললেন।

তিনি আগেই সন্দেহ করেছিলেন ডাঃ অনুপম এই কথাটাই জিজ্ঞেস করবেন। ” জ্বীন শারীরিক সম্পর্ক করবে, এটা বিজ্ঞান মানেনা। ইনফ্যাক্ট বিজ্ঞান তো জ্বীন জাতির অস্তিত্বকেই মানেনা। মানার কথাও না। ” –” তুমি তোমার ধর্মের কথা বলো। ” –” হ্যা আছে। ” –” তাহলে তোমার কি মনে হয়, রাতে ঘুমের ভেতর এই ধরনের জ্বীন এসে মিমির সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে? আচ্ছা এতে কি প্রেগন্যান্ট হওয়া পসিবল? মানে জ্বীন আর মানুষ সম্পূর্ণ ভিন্ন জাতি যতটা আমি শুনেছি।

এদের মিলনে বাচ্চা হতে পারে ব্যাপারটা কেমন হাস্যকর না? না মানে, তাহলে পৃথিবীর কোনো না কোনো প্রান্তে তো শুনতাম এমন খবর।” যুথি আবারও নিশ্বাস ফেললো। ডাঃ অনুপম কি ইসলাম ধর্মকে নিয়ে রসিকতা করছেন? নাকি সিরিয়াসলিই কথাগুলো বলছে! –” আমি ঠিক জানিনা। তবে আমাদের উচিত মেডিকেল টার্ম গুলো ফলো করা এবং সে অনুযায়ী আগানো।

ডাঃ অনুপম বললেন, ” বেশ, দেখা যাক কি হয়। তোমার বাসা চলে এসেছে। যাও তাহলে। কাল দেখা হবে। বাই ” . যুথি জবাব দিলনা।গাড়ি থেকে বেরিয়ে বাসায় ঢুকে গেলো। …. মিমি নিজের বিছানায় শুয়ে পেটের উপর হাত দিয়ে আনমনেই হালকা করে চাপ দিচ্ছে। এটা সে কেন করছে নিজেও জানেনা। একটু আগেই তার মা মশারী টানিয়ে রুমের লাইট অফ করে দিয়ে গেছেন। গত কয়েক সপ্তাহের ঘটনাগুলো ভাবছে মিমি। কি বিশ্রী অনুভুতি। ঘুমের ভেতর কেউ খুব বাজেভাবে তাকে স্পর্শ করে।

শক্তকরে বিছানার সাথে চেপে ধরে। মিমির প্রথম প্রথম স্বপ্ন মনে হতো। সে ভেবেছিলো আগের মতই এটা স্বপ্ন। কিন্তু পরে সে বুঝতে পারে এটা স্বপ্ন না। স্বপ্ন হলে যে জিনিসটা তার সাথে এমন করে, মিমি তাকে দেখতে পেতো। হাজার চেষ্টা করেও মিমি ঐ সময় চোখ খুলতে পারেনা। তবে মিমি জানে ওই জিনিসটা দেখতে কেমন। কারণ এর আগে স্বপ্নে বহুবার এটা তাকে তাড়া করেছে।

মিমির প্রচন্ড ঘুম পাচ্ছে। কিন্তু সে ভয়ে ঘুমুতে পারছে না। কারণ এখনও ওটা আসে। এসে বাজেভাবে তাকে স্পর্শ করে। গতকাল রাতে মিমি মাঝরাতে জেগে আবিষ্কার করেছিল, তার পরনের জামাটা খোলা। এমনকি সালোয়ারের দড়িটাও খোলা। তারপর সারারাত সে লাইট জ্বালিয়ে বসে ছিলো। বাকি রাত জেগেই কাটিয়েছিলো। এসব কথা সে কাউকে বলতে পারেনা। কাকেই বা বলবে! একজনকে বলতো, সেও তো হারিয়ে গেলো। যেদিন সে হারিয়ে গেলো, তার পরদিন থেকেই বাজে জিনিসটা তাকে ঘুমের ভেতর জ্বালাতন করে।

মিমি চোখ বন্ধ করে খুব অস্পষ্ট ভাবে দু’বার বললো, ” তুমি কোথায় নীল, তুমি কোথায়? আমার যে তোমাকে খুব দরকার।” মিমির চোখের কোন বেয়ে দু’ ফোঁটা জল গড়িয়ে বালিশে পড়লো। … মিমি কখন ঘুমিয়ে পড়েছে তা সে টের পায়নি। মাঝরাতে অনেকদিন পর মিমি সেই পুরনো স্বপ্নটা দেখলো। ঘুমের ভেতরেই সে আনন্দে ছটফট করতে লাগলো। আবার পরক্ষনেই তার মুখে বিষাদের ছায়া দেখা দিলো। ঘুমের মধ্যেই বিড়বিড় করতে করতে আচমকাই চিৎকার করে মিমি জেগে উঠলো।

Author: admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *