ফাইল টা হাতে নিয়ে খুলে দেখি ফাইলের ভিতরে কিছু কাগজপত্র

ফাইল টা হাতে নিয়ে খুলে দেখি ফাইলের ভিতরে কিছু কাগজপত্র।ওগুলা ছিল মাসুদের চাকরির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজ পত্র।যা সত্যায়িত করে জমা দিতে হবে মেইন অফিসে।মাসুদের পরিবারের তখন আমি ছাড়া আর কোনো মানুষ ছিল না যে কাগজগুলো সত্যায়িত করে ঠিকমত জমা দিতে পারবে।তাই-ই হয়ত মাসুদ আমাকেই ফাইলটা দিতে বলছে।ঠিক প্রোয়জন মত আমিও সব কাগজাদি গুলা ঠিক করে জমা দিই।কিছুদিন পর মাসুদের চাকিরাটাও কমপ্লিটলি হয়ে যায়।মাসুদ,আমি,শ্বাশুড়ি মা আমরা সবাই বেশ খুশি।

চাকরিরত অবস্থায় প্রথম প্রথম আমাদের সম্পর্ক ভাল থাকলেও,মাসুদ আমার খোঁজ নিলেও দুই তিন মাসের মাথায় পুরোপুরি যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।তখন তো আর ফোনের তেমন ব্যবস্থা ছিলনা।চিঠিই ছিল একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম।এত এত চিঠি লিখতাম মাসুদকে।দিনের পর দিন অপেক্ষা করতাম একটা চিঠির আশায়।কিন্তু দিন শেষে একটা চিঠির উত্তর আসতো না আমার কাছে।

আমি খুব চিন্তায় পরে যাই।মাসুদের জন্য বুকের মধ্যে কষ্ট হয়।বার বার ভাবতে থাকি মাসুদের কোনো বিপদ হলো নাতো আবার।আমি তখনও ভাবতে পারিনি আমার সাথে কি হতে চলেছে। আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না।অনেকদিন অপেক্ষা করে আমি মাসুদের বাড়িতে শ্বাশুড়ি মায়ের কাছে যাই।শ্বাশুড়ি মা আমাকে দেখে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।অনেক আদরে ঘরে তোলেন।

শ্বাশুড়ি মা কে সব খুলে বলি।জিগ্গেস করি মাসুদের কথা।মাসুদের কোনো খোঁজ তার কাছে আছে কিনা।আমার শ্বাশুড়ি আমার কথায় আরো অবাক হয়ে বলেন,,, -কি বলিস মা,মাসুদের সাথে তোর সাথেও যোগাযোগ নেই।আমরা অনেক চেষ্টা করছি যোগাযোগ করার।কিন্তু পারছিনা।ভাবলামম তোর সাথে হয়ত যোগাযোগ আছে তাই উল্টো আমি আরো তোর কাছে যেতে চাইলাম।

শ্বাশুড়ি মায়ের কথা শুনে যেন আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো,,,পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে আমার।কি করবো বুঝতে পারছিনা।কি করে মাসুদের খোজ নিবো আমি।অনেক ভেবে নিজেকে শক্ত করলাম।শ্বাশুড়িকে নিয়ে রওনা হলাম মাসুদের চাকরির জায়গায়।কিন্তু সেখানে গিয়ে যা শুনলাম তাতে আমার পাগলের মত অবস্থা হলো।শুনলাম মাসুদ নাকি পোস্টিং নিয়ে অন্য কোথাও চলে গেছে।কোথায় গেছে কেউ জানেনা।

আমি বুঝতে পারছিলাম না ঐ মুহূর্তে আমার কি করা উচিত ছিল।কিছুই করতে পারিনি আমি।খোঁজ না পেয়ে ব্যর্থ হয়ে শ্বাশুড়িকে নিয়ে ফিরে আসি বাড়িতে।শ্বাশুড়িকে বাড়িতে রেখে আমি বাবার বাড়ি চলে যাই।অপেক্ষা করি দিনের পর দিন।হয়ত মাসুদ ফিরে আসবে। . হঠাৎ একদিন খবর পাই মাসুদ বাড়িতে আসছে।দেহে যেন প্রান ফিরে ফেলাম।অনেক খুশিতে, অনেক আশা নিয়ে মাসুদের বাড়িতে গেলাম।কতদিন পরে মাসুদের সাথে দেখা হবে আমার।

তড়িঘড়ি করে মাসুদের বাড়িতে গেলাম।মাসুদের বাড়িতে যাওয়ার পরে আমার সামনে এমন একটা পরিস্থিতি আসবে যা আমি কখনও কল্পনাও করিনি।আমি শুধু ভাবছিলাম এগুলা কি সত্য,নাকি কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছি আমি।নিজের গায়ে নিজে চিমটি কাটি।না দুঃস্বপ্ন না,সবই আমার নিয়তি। সেদিন মাসুদের বাড়িতে গেলে মাসুদ আমাকে অস্বীকার করে।মাসুদ স্পষ্টভাবে বলে দেয়।

আমি কে,আমাকে সে চেনেনা।মাসুদের সাথে আমার কোনো সম্পর্কই নাই।মাসুদের সাথে আমার কোনোদিনই বিয়ে হয়নি।মাসুদকে এসব বলতে বাধা দিতে চাইলে মাসুদ আমাকে ধাক্কা দিতে দিতে ঘর থেকে বের করে দেয়ে আর মুখের উপর কথা গুলা বলে।আমি বিশ্বাস করতে পারছিনা,এই কি সেই মাসুদ যাকে আমি ভালোবেসেছিলাম।এই কি সেই মাসুদ যে আমি বলতে পাগল ছিলো।

খুব জোরে চিৎকার করে কান্না করতে ইচ্ছে করছিলো আমার।মাসুদের কাছে ঠাই না পেয়ে শ্বাশুড়ি মায়ের কাছে যাই।শ্বাশুড়ি মাকে জিগ্গেস করি মাসুদ এমন বিহেভ কেন করছে আমার সাথে।ওর মাথায় কি কোনো সমস্যা হইছে নাকি বুঝতাছিনা।উত্তরে শ্বাশুড়ি মা আমাকে বলে হ্যাগো মেয়ে মাথায় তো সমস্যা তোমার।আমার ছেলে কবে তোমাকে বিয়ে করছে।আমার ছেলের নামে বদনাম দিও নাতো।

শ্বাশুড়ি মায়ের কথা শুনে আমার মাথা ঘুরতে থাকে।কি শুনছি আমি এগুলা।এসব শোনার থেকে তো মরে যাওয়া অনেক ভালো।অনেক কেঁদেছি সেদিন।কাঁদতে কাঁদে মাসুদ আর শ্বাশুড়ি দুজনার পা চেপে ধরে লুটিয়ে পরি।মাসুদরা সেদিন আমাকে ওদের পায়েও ঠাই দেয়নি।আমার শ্বাশুড়ির একটাই কথা ছিল,,, -আমাকে যে তার ছেলে বিয়ে করছে তার প্রমান নিয়ে তারপরে যেতে। শ্বাশুড়ির কথা শুনে তো আমি অবাক।যে নিজে আমাদের বিয়ের প্রমান স্বরুপ ছিল সে কিনা আজ প্রমানের কথা বলছে।

সেদিন কিছুই করার ছিল না আমার।তবে আমিও হাল ছাড়ার পাত্রী ছিলাম না।প্রমান জোগাড়ের জন্য প্রস্তুতি নিলাম।যে কাজি আমাদের বিয়ে পড়াইছে তার বাড়িতে গেলাম প্রমান স্বরুপ কাবিন নামা তুলতে।কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখি আরেক কান্ড।কাজি কিছুতে আমার কাবিন নামা তুলতে রাজি নন।কাজির সাফ সাফ কথা ছিলো আমি কোনো কাবিন নামা তুলতে পারবোনা।আপনি অন্য জায়গায় চেষ্টা করেন।

এই কাবিননামা তুলতে গেলে আমার প্রানের ঝুকি আছে।আমি আমার প্রানের ঝুকি নিতে পারবোনা। . কাজিকে হয়ত ভয় বা অর্থবিত্তের প্রলোভন দেখিয়ে দমিয়ে রাখছে। কাজির কাছ থেকেও ব্যর্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আসি।শেষ ভরসাটুকুও আর আমার রইলো না।পরে অন্য জায়গা থেকেও কাবিননামা তোলার চেষ্টা করছি কিন্তু এক কাজির পড়ানো বিয়ের কাবিন অন্য কাজি তুলতে পারবেনা বলে জাহির করে।আমার আর কিছুই করার ছিল না।

আমার মনে একটা প্রশ্নই ঘুরপাক খায়।আমি যদি কাবিননামা তুলে প্রমান নিয়েও মাসুদের বাড়িতে যাই,হয়ত লোকের ভয়ে আমাকে মেনে নিবে।এক দিন,দুই দিন,তিন দিন।চার দিনের দিন আবার মাসুদ যে আমাকে ছেড়ে দিবেনা তার কোনো গ্যারন্টি নাই।মাসুদ আমাকে মেনে নিলেও হয়ত ভালবাসতে পারবে না।

আর যেখানে ভালবাসা নেই সেখানে গিয়ে কি করবো আমি।অবহেলার পাত্রী হওয়ার থেকে দুরে থাকাই ভাল।এই ভেবে হার মেনে নিই আমি।বাবার বাড়িতে চুপচাপ পড়ে থাকি। . আস্তে আস্তে আমার পরিবারের সবাইও সব কিছু জেনে যায়।কিন্তু কারোরই কিছু করার থাকেনা।ঐ যে বল্লাম বড় লোকের বিরাট কারবার।মাসুদদের সাথে লড়ে কখনওই পারবো না।

এখন তো অস্তিত্ব আছে,তখন হয়তো আমার অস্তিত্বও মুছে ফেলবে মাসুদরা।এসব ভেবেই আমার পরিবার আর সামনে আগায় না।যা হওয়ার হইছে,মাসুদের চিন্তা বাদ দিয়ে আমাকে সামনে আগাতে বলে। . ঐ ঘটনার পর দু’মাসে আমাকে কেউ ভাত খাওয়াতে পারেনি।জোর জবরদস্তি করে খাওয়ানোর চেষ্টা চালাতো সবাই।সারাক্ষন ঘরের দরজা বন্ধ করে কাঁদতাম।

কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে যেতাম।আমার হাতের মুঠোয় সব সময় বিষের শিশি থাকতো।কাঁদতে কাঁদতে মাঝে মাঝে ভাবতাম এখনি খেয়ে মরে যাবো।এ জিবনে বেঁচে থেকে কি হবে।কিন্তু আল্লাহ তা’আলার অশেষ রহমত ছিলো আমার উপর।কেমন যেন আল্লাহ আমাকে অনেক ধৈর্যশক্তি দিয়েছিলো।হাতের মুঠোয় বিষ থাকলেও কখনও খাওয়ার চেষ্টা করিনি।

বার বার আমার মনে হয়,উপর থেকে কেউ আমাকে বলছে আত্মহত্যা মহাপাপ।পৃথিবীর বুকে দহনে জ্বলছি মরলে জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হবে।একুলও পেলাম না আর ওকুলও পাবোনা।এই ভেবে আর মরাও হয় না আমার। ঘটনার তিন মাসের মাথায় আমার কাছে খবর আসে মাসুদ দ্বিতীয় বিয়ে করছে।মেয়ে নাকি বেশ সুন্দরী,আর প্রভাবশালী পরিবারের মেয়ে।

শুনে কষ্ট লেগেছিল,কেঁদেও ছিলাম অনেক।কিন্তু করার কিছুই ছিলো না।কিন্তু কথায় আছেনা আল্লাহ তা’আলার বিচার বিচারই হয়।আল্লাহ মাসুদের বিচার পৃথিবীতেই দেখাইছে।মাসুদ দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলো সত্য কিন্তু বউ নিয়ে সংসার করতে পারেনি।শুনেছি বিয়ের ১৩ দিনের মাথায় বউ তার লোকজন নিয়ে এসে মাসুদকে মারধর করে ফেলে রেখে অন্য এক পুরুষের সাথে চলে যায়।কারন মেয়ে নাকি পরিবারের কথায় মাসুদকে বিয়ে করেছিল।মেয়ের নিজের মত ছিলো না বিয়েতে,কারন সে অন্য কাউকে ভালবাসে।

Author: admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *